মেঘা
রাত্রি প্রায় সাড়ে বারোটা। বেডরুম লাগোয়া ছোট্ট ব্যালকনিটাই চেয়ার লাগিয়ে বসে আছে প্রিয়া আর সুরভী। প্রিয়া জন্মদিনে পাওয়া গিফ্ট গুলো একে একে খুলতে ব্যস্ত। অমিত ওকে একটা পারফিউম দিয়েছে, ঠিক ওদের সদ্য গড়ে ওঠা প্রেমের মতোই মিষ্টি। বারবার ওটা কবজিতে লাগাচ্ছে আর বাচ্চামেয়ের মতো খুশি উপচে পড়ছে ওর।
সুরভী ওর ঝলমলে মুখটা দেখছিল। গত কয়েকদিন ধরেই চাপা টেনশনে ভুগছিল প্রিয়া। কোনো এক নম্বর প্রায় বিরক্ত করছে মেয়েটাকে। ফোন আসলেই মুখটা শুকিয়ে যায় ওর। দু এক বার যদিও জিজ্ঞাসা করেছে সুরভী কিন্তু প্রিয়া বলেনি তেমন কিছুই। আজ অনেকদিন বাদে ওকে আবার খুশি হতে দেখে খুব ভালো লাগছে সুরভীর।
তবে কয়েকটা ব্যাপারে বেশ বিরক্তই হয়েছে ও। বেশিক্ষন চাপতে না পেরে শেষমেশ বলেই ফেলল সুরভী, 'পার্থকে তুই আজ আজ ইনভাইট করতে গেলি কেন প্রিয়া? জানিস তো ওকে আমার পছন্দ নয়। দিনরাত ছোঁকছোঁক করে খালি।'
প্রিয়া একটা গিফ্ট রাপার খুলতে খুলতে বলল, 'মোটেই পার্থ ওরকম ছেলে নয় সুরভী। ও হয়তো সত্যি তোকে ভালবাসে। নাহলে সেদিন ধ্রুভের পার্টি থেকে তুলে নিয়ে আসতনা।'
সুরভী অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করে, 'কি, সেদিন পার্থ আমায় ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়েছিল..? কিন্তু ও তো পার্টিতে ছিলনা সেই রাতে'
প্রিয়া : 'হ্যাঁ কিন্তু শুধু তোর জন্যই গিয়েছিল ওখানে। ধ্রুভের পুরানো কলেজ ফ্রেন্ডবলে অসুবিধাও হয়নি ওর পার্টিতে ঢুকতে। তুই শুধু শুধু ধ্রুভের পিছে পড়ে আছিস সুৃরি'।
ওকে চুপ দেখে প্রিয়া আরও বলে চলে, ' ছেলেটা সত্যি তোর চিন্তা করে সুরি, সেদিন রাত দুটোয় তোকে ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে গিয়ে বলল অফিস কলিগ তোর। পরশু আবার ওর সাথে বিগবাজারে দেখা তো ইনভাইট করাটা ভদ্রতা মনে হল আমার।'
'দেখ প্রিয়া, পার্থ যেমনই হোক আমার কোনো ইনটারেস্ট নেই। আর তুই আমায় কোনোদিন বলিসনি তো আরুহী সান্যালকে চিনতিস তুই, ইনফ্যাক্ট খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিলিস তোরা।'
প্রিয়া আচমকা এই প্রশ্নে বেশ থতমত খেয়ে যায়। তারপর বলে, 'হ্যাঁ মানে ওই ওর ডেথ-এর পর অযথা অনেক পুলিশি হয়রানি হয়েছিল আমার। তাই ওইসব প্রসংগ তুলতে চায় না।'
সুরভী চুপ করে থাকে। একটু থেমে প্রিয়া আবার শুরু করে, 'আমি বরাবরই দিল্লীতে মানুষ।পড়াশোনা, কলেজ সবকিছুই ওখানে বলতে গেলে। একটা সেমিনারে প্রথম আলাপ আরুহীর সাথে। আরুহী সান্যাল।কলকাতার মেয়ে। প্রথম প্রেজেন্টেশনেই কেতাদুরস্ত স্মার্ট আরুহী নজর কেড়েছিল সবার। জানিনা কেন আমার সাথেই ওর বন্ধুত্বটা একটু বেশি হয়েছিল। যতদিন দিল্লীতে ছিল ওদের গ্রুপটা, বাড়ি নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে গোটা দিল্লী ঘুরিয়েছিলাম আমি ওকে। একবছর পরে যখন আমি কলকাতার এই জবটার অফার পায় সম্পূর্ন অজানা অচেনা শহরটায় চলে এসেছিলাম শুধু ওর ভরসাতেই।কয়েকমাস পর ওর ফ্ল্যাটে সিফটও করেগিয়েছিলাম আমি।'
সুরভী বলে, 'তারপর...?'
প্রিয়া: 'ওখানেই প্রথম দেখলাম ধ্রুভকে। ওর ফ্ল্যাটে আসতো প্রায়। আরুহীর সাথে আমিও বারকয়েক গেছি ধ্রুভের পার্টিতে।তবে প্রথম থেকেই ধ্রুভকে অ্যাভোয়েড করতাম আমি।একদম ভালো লাগতোনা ওকে।'
সুরভী: 'আচ্ছা আরুহী আর ধ্রুভ কি রিলেশনে ছিল..?'
প্রিয়া: ' হ্যাঁ ওরা এনগেজড ছিল। তবে ধ্রুভের মতো ছেলে কখনও কাউকে ভালবাসতে পারে বলে মনে হয়না।'
সুরভী ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, 'কি করে মারা গেল আরুহী ?'
প্রিয়া: 'সেটাই তো আসল রহস্য। সেবার ও আর ধ্রুভ গিয়েছিল মানালি।তার কদিন আগে থেকেই বলছিল আরুহী একটা অজানা নাম্বার থেকে ওর ফোন আসছে প্রায়। কেউ নাকি মারতে চাইছে ওকে। আমাকেও বলেছিল যেতে কিন্তু অফিসের কাজে গুরগাঁও যেতে হয়েছিল তখন। আরুহীর সাথে গেলে হয়তো এভাবে মরতে হতোনা ওকে।
সুরভী: 'তারপর...?'
প্রিয়া: 'তারপর হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলায় ও আমায় ফোন করে বলেছিল ধ্রুভের সাথে ঝগড়া হয়েছে খুব। ধ্রুভ নাকি মারতে চায় ওকে।'
সুরভী চমকে ওঠে, 'এসব কি বলছিস তুই ? ধ্রুভ এমন কাজ করতেই পারেনা।'
প্রিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, 'তুই ধ্রুভকে চিনিস না সুরি। ওই ছেলে যাকিছু করতে পারে। তারপরদিনই শুনলাম ওর গাড়ীটা অ্যাক্সিডেন্ট করেছে পাহাড়ের ধ্বসে।'
সুরভী : 'এটা তো স্বাভাবিক মৃত্যুও হতে পারে প্রিয়া। পাহাড়ের সরু রাস্তায় ড্রাইভার ঠিকমতো সামলাতে না পেরে বা পাহাড়ে ধ্বস পড়ে এরকম কত অ্যাক্সিডেন্ট হয়।'
প্রিয়া: 'তুই বুঝতে পারছিস না সুরি।মেয়েটা মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে পর্যন্ত আমায় ফোন করে বলেছিল ধ্রুভ ওকে মারতে চায়। তাই চলে যাচ্ছে ও ওই হোটেল ছেড়ে।আর তার কিছুক্ষন বাদেই আরুহী মারা গেল.? তোর এটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে কোন অ্যাংগেল থেকে.?'
সুরভী চুপ করে থাকে। উত্তর দিতে পারে না কিছুই। প্রিয়া বলে চলে, 'সে রাতে কুয়াশা আর বরফে দেখা যাচ্ছিল না প্রায় কিছুই।কোনো ড্রাইভার রাজী হচ্ছিলনা গাড়ী নিয়ে বের হতে। তবুও আরুহী নাকি শোনেনি। হোটেলের লোকেরা শুনেছিল ধ্রুভ আটকানোর চেষ্টা করেছিল খুবই, কথা কাটাকাটিও হয়েছিল ওদের মধ্যে অনেক।আরুহী ধ্রুভকে বলেছিল ওর মুখোশ খুলে ফেলবে সবার সামনে। তখন ধ্রুভ নাকি শাসিয়েছিল এমন করলে রেহাই পাবেনা আরুহীও।তারপর ধ্রুভ চলেগিয়েছিল নিজের রুমে। এর আধঘন্টা বাদে অনেক কষ্টে একজন ড্রাইভারকে রাজী করায় আরুহী। আমায় খালি বলেছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধ্রুভের নাগালের বাইরে যেতে চাই ও।আর বেরোনোর মিনিট কুড়ি বাদেই পাহাড়ী ধ্বসে গভীর খাদে তলিয়ে যায় আরুহীর গাড়ি। তবে রহস্যজনকভাবে বেঁচে যায় গাড়ির ড্রাইভার।'
সুরভী : 'পুলিশ কিছু করেনি.? মানে হোটেলের লোকগুলো তো শুনেছিল ওদের ঝগড়াটা। বা গাড়ির ড্রাইভার.?'
প্রিয়া: 'জানিনা। ধ্রুভের টাকায় হয়তো মুখ বন্ধ করেদিয়েছিল পুলিশের। আর ড্রাইভার নতুন লোক। টাকার লোভে রাস্তায় বেরোতে রাজী হয়েছিল মাত্র।
সুরভী: 'হুমম্ ব্যাপারটা যথেষ্ট সন্দেহজনক।
'প্রিয়ার চোখে জল চিকচিক করছে, 'অথচ পুলিশ তেমন কিছু তদন্ত করলই না। ধ্রুভ বেঁচে গেল ঠিক ওর বাপের জোরে। আমরা খুব ভাল দোস্ত ছিলাম রে সুরভী। ওর এভাবে চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছিনা মোটেই। তারপর বেহালার ফ্ল্যাট ছেড়ে এখানে চলে আসি আমি।'
সুরভী বলল, 'হুম্। হুম্ তোকে বলা হয়নি। বেহালার কথায় মনে পড়ল।ওখানে তো আরুহীর মামার বাড়ি। শুনলাম ওনারা নাকি খুব ভালবাসতেন তোকে। একটা শাড়ি গিফ্ট করেছেন তোর জন্য। দাঁড়া আমি নিয়ে আসছি।'
প্রিয়ার চোখ কপালে উঠে যায়। খুব অবাক হয়ে বলে, ' কি? বেহালায় আরুহীর মামার বাড়ি? আর তারা নাকি আমায় খুব ভালবাসে বলে উপহার পাঠিয়েছে? কই আমিতো জানিনা ওখানে আরুহীর কোনো রিস্তেদার ছিল বলে?'
সুরভীও খুব অবাক হয়, ওর হাতে ধরা গিফ্টের প্যাকেটটা প্রিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, 'সত্যি বলছিস? কিন্তু এক ভদ্রলোক এসে তো এটা দিতে বলেগেলেন তোকে।'
প্রিয়া তাড়াতাড়ি গিফ্টের প্যাকেট টা খুলতে থাকে। শাড়ী বা কোনোকিছুই নেই তাতে। খালি কয়েকটা ফোটো প্রিয়া আর আরুহীর। আরুহীর মুখগুলো সব ফোটোতেই কালি লেপে নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আর প্রিয়ার মুখগুলো লাল কালিতে ক্রশ চিহ্ন দেওয়া। আরেকটা বার্ডডে কার্ডে লেখা , 'হ্যাপি বার্ডডে ডিয়ার। নাউ ইটজ ইয়োর টার্ণ।'
প্রিয়ার হাত থেকে বক্সটা পড়ে যায়।আতংকে চোখমুখ রক্তশূন্য বেচারার।
সুরভী ওর হাত দুটো ধরে বলে, 'তুই নিশ্চয় আমায় কিছু লুকাচ্ছিস প্রিয়া। বল কি হয়েছে।'
প্রিয়া চোখমুখ স্বাভাবিক করে বলে, 'আমি এত দুর্বল নয় সুরভী যে এইটুকুতেই ভেঙে পড়ব। যত বাধায় আসুক এর শেষ দেখে ছাড়ব আমি।'
সুরভী অবাক হয়ে যায়। বলে, 'কি বলছিস আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।'
প্রিয়া:'আমি তোকে কিছুই বলতে পারবো না এখন সুরি। শুধু আমায় বন্ধু ভেবে থাকলে একটু বিশ্বাস রাখিস।'
প্রিয়া উঠে নিজের ঘরে চলে যায়। সুরভী অনেক রাত ওবধি এলোমেলো ঘটনা গুলো সাজাতে থাকে।
********
দুদিন হয়ে গেল প্রিয়ার কোনো খবর নেই। সেই ঘটনার পর দুদিন ঘরে বসেছিল চুপচাপ। এমনকী অফিসও যায়নি। সুরভী জিজ্ঞাসা করায় শুধু বলেছে 'আমার কিছু হলে আমাদের বন্ধুত্বের উপর বিশ্বাস রাখিস।'
তারপর পরশু সকালে উঠে ওকে আর দেখতে পায়নি সুরভী। প্রথমে ভেবেছিল অফিস গেছে। কিন্তু পরে কলিগদের ফোন করে জেনেছে প্রিয়া অফিসে আসছে না গত তিনদিন ধরেই। তার মানেই পরিষ্কার মেয়েটা অফিস যায়নি। যদিও সেদিন রাত নটার দিকে সুরভীর মোবাইলে মেসেজ এসেছিল বিশেষ প্রয়োজনে প্রিয়াকে বাড়ি যেতে হচ্ছে কিছুদিনের জন্য, তাড়াতাড়িতে জানানো হয়নি । সুরভী যেন অযথা চিন্তা না করে।
কিন্তু চিন্তা করবে না বললেই কি চিন্তাটা চলে যায় ? বিশেষ করে প্রিয়ার জন্মদিনে সেই লোকটার অদ্ভুত পার্সেলটা দিয়ে যাওয়ার পর। পরিষ্কার ভাষায় হুমকি দেওয়া ছিল ওতে। প্রিয়ার সাথে একবার কথা বলতে চেয়েছিল সুরভী। যথারীতি ওর নম্বর নেটওয়ার্ক সীমার বাইরে। ব্যাপারটা কেমন গন্ডগোলে ঠেকছে যেন। ওর অফিস কলিগদেরও একই মেসেজ করেছে প্রিয়া, মায়ের অসুস্থতার জন্য তড়িঘড়ি দিল্লী যেতে হচ্ছে প্রিয়াকে। অথচ পুলিশ ডিপার্টমেন্টে থাকা এক পরিচিতর মাধ্যমে খবর নিয়েছে সুরভী ট্রেনে কি ফ্লাইটে ওই বিশেষ দিনে প্রিয়া আগরওয়াল নামে কোনো যাত্রী ছিল না। এমনকী তার পরের দিনও না। গেল কোথায় মেয়েটা ?
ক্রমশ: একটা রহস্যের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে সুরভী। প্রথমে আরুহীর রহস্যজনক মৃত্যু, তারপর প্রিয়ার কাছে আসা ওই পার্সেল আর হঠাৎ করেই প্রিয়ার বাড়ি চলে যাওয়া বলা ভালো গায়েব হয়ে যাওয়া। ঘটনা গুলো কি নেহাতই কাকতালীয় নাকি কোনো যোগসূত্র আছে এদের মধ্যে..?
***********
রেস্টুরান্টের আলোআঁধারি পরিবেশটা বেশ মনোরম। মৃদুসুরে পিয়ানো না কি একটা ইন্স্ট্রুমেন্টের আওয়াজ ভেসে আসছে।এই দুতিন দিন অফিসের সময় টুকু ছাড়া বলতে গেলে নিজেকে ফ্ল্যাটেই বন্দী করে রেখেছে সুরভী। নো শপিং, নো আউটিং, নো পার্টি। ধ্রুভ ফোন করেছিল দুএকবার এমনকী দেখাও করতে চেয়েছিল কিন্তু সুরভী স্রেফ না করে দিয়েছে। আসলে প্রিয়ার কাছে সবটুকু শোনার পর ধ্রুভের আসল চেহারা পরিষ্কার হয়ে গেছে ওর কাছে। তাই যথাসম্ভব এখন দূরত্ব বজায় রাখছে সুরভী।
আজ অফিস থেকে বেড়োতেই যাচ্ছে এমন সময় ধ্রুভের ফোন।সারপ্রাইজ ডিনারের প্ল্যান করেছে, সন্ধ্যা সাতটার দিকে পিক করবে ওকে ফ্ল্যাট থেকে।সুরভী যদিও যেতে চাইছিল না একেবারে কিন্তু ধ্রুভ কোনো কথায় শুনল না। বলতে গেলে প্রায় জোর করেই নিয়ে এসেছে সুরভীকে ।
ওকে অন্যমনস্ক দেখে ধ্রুভ জিজ্ঞাসা করল, ' কি ম্যাডাম জায়গাটা পছন্দ নয় নাকি আমাকে ?'
সুরভী হেসে বলল, 'না না সেরকম কিছু নয়।'
ককটেলে একটা আলতো চুমুক দিল ধ্রুভ, ' তাহলে তখন থেকে কি অত ভাবছ ? মুড অফ কেন ? কদিন ধরেই দেখছি আমায় অ্যাভোয়েড করছ ?'
সুরভী : ' না না আসলে আমার রুমি কে নিয়ে একটু ডিস্টার্বড ছিলাম আরকি!'
ধ্রুভ : 'ওহ্ তোমার রুমি মানে সেই প্রিয়া ? কি করেছে ও ? এনি প্রবলেম ?'
সুরভী : ' না কিছু করেনি ও। কদিন হল আমাকে বা কাউকে না জানিয়েই হঠাৎ করে বাড়ি চলে গেছে ও।'
ধ্রুভ : 'ডোন্ট ওরি বেবি। এতে টেনসন নেওয়ার কি আছে ? চিল্ ।'
সুরভী: 'না আসলে হঠাৎ করেই চলে গেছে তো।এমনকী ফোনটাও সুইচ্ড অফ বলছে। ভাবছি কোনো বিপদে পড়ল না তো।'
ধ্রুভ : 'কেন বিপদে পড়বে কেন ? এরকম কিছু তোমায় বলেছে নাকি ?'
সুরভী নিজেকে সামলে নেয়। বুঝতে পারে ধ্রুভকে সবকিছু বলাটা উচিত হবে না মোটেই। কে জানে প্রিয়ার এই রহস্যের পিছনে ধ্রুভের হাত আছে কিনা। 'আরে না না। আসলে এরকম করে না তো কোনোবার। বাড়ি বা কোথাও গেলে আমায় জানিয়েই যায় বরাবর। তাই চিন্তা হচ্ছে।'
ধ্রুভ : ধুস্।ওকে জানা আছে আমার । আরুহীরও রুমি ছিল তো। ও ওইরকমই ক্রেজি।'
সুরভী : 'তুমি প্রিয়াকে চেনো তাহলে ?'
ধ্রুভ : 'চিনব না? প্রিয়া আগরওয়াল কে চিনব না ?দুনিয়া শুদ্ধু লোক জানে আমার ওপর হিউজ ক্রাশ ছিল প্রিয়ার। আমি আর আরুহী এনগেজ্ড জেনেও কয়েকবার প্রোপোজ ওবধি করেছিল। কিন্তু আমি রাজী ছিলাম না। আরুহী আমার ফিঁয়াসে শুধু ছিল না এক্কেবারে ছোটোবেলার বন্ধু। ওকে আমি চিট করার কথা ভাবতেও পারতাম না। কিন্তু আরুহীর অন্ধবিস্বাস ছিল প্রিয়ার উপর। বন্ধুত্বের বিশ্বাস। কত বুঝিয়েছি আমি।'
ধ্রুভকে মাঝপথে থামিয়ে দিল সুরভী, ' আরুহী কি করে মারা গেল ধ্রুভ ?'
ধ্রুভের মুখটা কঠিন হয়ে যায়, তারপর আলতো হেসে বলল, ' ওহ্ তারমানে তোমার মনেও আমায় নিয়ে সন্দেহের বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছে প্রিয়া ?'
টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ধ্রুভ। চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারন করল, 'এখন তো আমি যাই বলব তুমি অবিশ্বাস করবে সুরভী।তাই এর জবাব দেওয়ার এমনকী আমাদের ভবিষ্যতে যোগাযোগ করার ও মানে হয় না।'
সুরভী ব্যস্ত হয়ে ওঠে। বলে ' কুল ডাউন ধ্রুভ। আমি একবারও সেটা মিন করিনি। বিলিভ মি।'
ধ্রুভের ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে গেছে, ' তাহলে কি মিন করতে চাইছ তুমি ? আজ যখন লাইফে আরেকবার ডিশিসন নিতে চাইছি একটা তখন কেন বলছ এসব..?' । ধ্রুভ থামে না, সুরভীর হাতদুটো হঠাৎ চেপে ধরে বলে ' তোমায় কেন এখানে আজ এনেছি জান সুরভী ? ডু ইউ নো হাউ ইম্পর্টান্ট ইউ আর টু মি ? আমি মানছি জীবনে অনেক ভুল করেছি কিন্তু বিশ্বাস কর আরুহী যাবার পর এতদিনে তোমায় দেখেই আমার মনে হয়েছে যার সাথে বাঁচা যায়,জীবন কাটানো যায়। আই রিয়েলি লাইক ইউ সুরভী, ইউ আর ভেরি স্পেশ্যল টু মি।'
সুরভী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ও কি সত্যি শুনছে। কে জানে জীবনে সবচেয়ে আকাঙ্খিত মুহুর্ত গুলো বোধহয় এরকম আনএক্সপেক্টেড ভাবেই আসে। প্রিয়ার হঠাৎ করে চলে যাওয়াটা একটু হলেও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেদিয়েছিল ওকে। অফিস, পার্টি, ধ্রুভকে ছেড়ে কদিন চিন্তাধারা সম্পূর্ন অন্যখাতে বইছিল যেন। সেইরাতে পর ধ্রুভকেই মনে মনে দোষী ভেবেনিয়েছিল সুরভী। কিন্তু কেন জানিনা আজ ধ্রুভকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে ওর। সেই পুরানো ভালোলাগাটা ফিরে আসছে আবার।ধ্রুভকে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই সুরভীর।
ওকে চুপ করে থাকতে দেখে ধ্রভ আবার বলতে শুরু করে, 'আমি আর আরুহী খুব সুখী ছিলাম। কিন্তু প্রিয়ার সেটা সহ্য হয়নি। সবাই ওদের খুব ভালো বন্ধু বলেই জানে বাট আমি জানি প্রিয়া কতটা জেলাস ছিল আরুহীর ওপর। আমাদের মধ্যে মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হত প্রায় ওর জন্য। সেবার মানালিতে গিয়েছিলাম আমি আর আরুহী। প্রিয়াও যেতে চেয়েছিল আমাদের সংগে কিন্তু আমি দিইনি। আমাদের পুরো ভ্যাকেসন টা কেটেছিল প্রায় ঝগড়া করেই। সেইরাতেও প্রচন্ড ঝামেলা করে হোটেল থেকে বেড়িয়েগিয়েছিল আরুহী। আমি আটকানোর অনেক চেষ্টা করেছিলাম।কিন্তু আরুহী শুনলো না কিছুতেই আর তারপর...' এই ওবধি বলে একটু থামল ধ্রুভ। তারপর ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ' সেই রাতেই অ্যাক্সিডেন্টটা হয় আরুহীর।আমি কিচ্ছু করতে পারিনি ওর জন্য। প্রিয়া আমায় বলেছিল ওর না হলে আমায় কোনোদিন হতে দেবে না অন্য কারো। আমার আর ওর মাঝে যেই আসবে তাকেই সরিয়ে ফেলবে প্রিয়া'
মাথা নীচু করে বসে আছে ধ্রুভ। সুরভী বুঝতে পারছেনা কাকে বিশ্বাস করবে। এটা সত্যি প্রথম থেকেই সুরভীকে ধ্রুভের থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রিয়া। সেটা আদৌ সুরভীর ভালোর জন্য নাকি ধ্রুভ কে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা প্রিয়ার কে জানে। প্রিয়াকে চিনতে কি তাহলে ভুল হয়েছে সুরভীর ? সহজ সরল বন্ধুত্বের আড়ালে থাকা প্রিয়ার মনের অন্ধকার দিকটা কি এতকাছে থেকেও ধরতে পারল না ও!
ধ্রুভে হাতটা চেপে ধরল সুরভী নিজের হাতের মুঠোয়। ধ্রুভ ভাঙা গলায় বলল , ' আমার ভয় হয় তোমাকেও আমার থেকে দূরে না সরিয়ে দেয় প্রিয়া। ওই মেয়ে আমাকে পাবার জন্য যা কিছু করতে পারে। আমায় প্রমিস কর সুরভী কোনোদিন ভুল বুঝবে না আমায় ?'। সুরভী ধ্রুভের হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে।
সেদিন রাতে একরাশ খুশি মেখে যখন নিজের ফ্ল্যাটে ফিরল সুরভী ঘড়িতে তখন রাত বারোটা। সবই ঠিক ছিল খালি একবার সুরভীর মনে হল প্রিয়ার ঘরটা যেন আরেকটু বেশী অগোছালো লাগছে আগের থেকে। ওর অনুপস্থিতিতে কেউ কি এসেছিল ফ্ল্যাটে ?
(চলবে)
No comments: