Results for লেখা লিখি

দুষণচক্রে তুমি বর্তমান



            নিতাই মালাকার

কিছু আজ লিখতে বোলো না মাগো —
ভেতর দেশের মা !
আজ আমাকে সারাদিন জঞ্জাল
বিষয়ে ভাবিয়ে ভাবিয়ে
পাগল করে রাখো ৷

'ফুসফুসের বিভিন্ন সংক্রমণজনিত অসুখে'
ভুগছে তুতিকোরিন ৷
ক্যান্সারে
আক্রান্ত
তুতিকোরিন ৷
তুতিকোরিনের মারণপরিবেশ
বিষয়ে ভাবিয়ে ভাবিয়ে
আজ আমাকে পাগল করে রাখো মাগো
ভেতর দেশের মা !

প্লাস্টিকের আধিপত্য ৷ আনাজের ডাঁই .....
অন্ধতা মাখা কালো
বাজারে ঢোকার গলি .....
আগুন লাগলে
দমকল ঢুকবে না ৷

আজও বুকের মধ্যে —
নাগেরবাজার পুড়ছে ...
পোড়া পোড়া স্মৃতি ঘুরছে .....
পোড়া গন্ধেরা —
ডানা মেলে উড়ছে , মাগো —
আজ আমি কিচ্ছু লিখবো না ৷
সারাদিন
ভাবিয়ে ভাবিয়ে পাগল করে রাখো ৷

জঞ্জালের পাহাড়ের মতো আজ আমাকে
অট্ট হাসতে দাও ৷

জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে , ধোঁয়া ধোঁয়া করে দাও মাগো —
ভেতর দেশের মা !
আজ আমাকে পাগল করে রাখো ৷

                        ফোটো সংগৃহিত

    
দুষণচক্রে তুমি বর্তমান দুষণচক্রে তুমি বর্তমান Reviewed by Dhuliyan City on 05:42 Rating: 5

মে : রাজনৈতিক-২৩

.       

           

লিখতে চাই বিশেষ একটি রচনা ......
স্বাধীন সার্বভৌম ভারতরাষ্ট্র এবং
মে-তেইশের
মহার্ঘ ফলাফল ......
একটি গুরুগম্ভীর
রচনা ধরতে চাইছি ....
রচনা পালাচ্ছে ঊর্দ্ধশ্বাস ....

দারুণ উত্তেজনায় —
চরিত্রের ডান-মধ্য-বাম —
এবং
আরও নানা দিক ......

চিন্তারা —
উঠছে ..... বসছে .......
তারা ফুটছে ...... তারা খসছে ......
ছুটছে ...... থামছে .......
কাঁপছে ...... জল মাপছে ........
ভাবছে ....
হাঁটছে .....
ঘামছে .........
সুযোগ বুঝে
নিচ্ছে বিশ্রাম .....

তেইশ .....
ওহো তেইশ !
আহা তেইশ !

তেইশ : পরপর্তী
শান্তি
না
সন্তাপ ?
আশীর্বাদ
না
অভিশাপ ?

মে-তেইশ
রচনাটির জন্য
স্বাভাবিক সংখ্যক
শব্দ প্রয়োজন ৷
নিজেকে —
গলদঘর্ম —
নানান দিকে ঠেলছি .....
আকাশে-পাতালে —
সিঁড়িতে-চাতালে —
উত্তেজিত আমি খেলছি ........

                     নিতাই মালাকার    
                    ----------------------

মে : রাজনৈতিক-২৩ মে : রাজনৈতিক-২৩ Reviewed by Dhuliyan City on 09:55 Rating: 5

সাজুর মোড়ের ইতিকথা

সাজুর মোড়ের ইতিকথা
        সুমিত ঘোষ।

রবিবাসরীয়' ছোটগল্প বিভাগে প্রকাশিত হুমায়ুন কবিরের 'শাঁজুর মোড়' (২১ শে এপ্রিল, ২০১৯) গল্প প্রসঙ্গে মাননীয় পাঠকগনের জ্ঞাতার্থে  কিছু সংযোজন করছি।
সাজুর মোড় বা সাজির মোড় হয়তো বা 'শাঁজুর মোড়' ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের (কলকাতা-শিলিগুড়ি জাতীয় সড়ক) উপর অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাসস্টপ । এই বাসস্টপে নেমে ঐতিহাসিক স্থান সুতি অথবা নিমতিতা রাজবাড়ী সরাসরি যাওয়ায় যায়। বিশ্ববরেণ্য চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায় এই নিমতিতা রাজবাড়িতে 'জলসাঘর', 'তিনকন্যা' ও 'সমাপ্তি' ছবির চিত্র গ্রহণ করেন। জমিদার জ্ঞানেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর কন্যার বিবাহ অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলাম  এই নিমতিতায় বরযাত্রী হিসেবে এসেছিলেন । এই বিবাহ আসরে কাজী নজরুল যোগীরাজ বরদাচরণ কে প্রত্যক্ষ করেন। তাঁরা পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরবর্তীকালে তিনি বরদাচরণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। নবাব মিরকাসিমের আমলে 'সুতি' র যুদ্ধ সমন্ধে আমরা সকলেই অবগত। এই সুতি বা ঔরঙ্গবাদ বা ধূলিয়ান  বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের অর্থনৈতিক মানচিত্রে একটি বিশেষ উল্লেখ যোগ্য স্থান। ঔরঙ্গবাদ-ধুলিয়ান হলো বিড়ি শিল্পের পীঠস্থান।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লেখ্যাগারের সংরক্ষিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের সি. আই. ডি. শাখার বিভিন্ন নথি থেকে এই এলাকার ডাকাত সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। এই অঞ্চলটি মুর্শিদাবাদ জেলার  সমসেরগঞ্জ থানা এলাকার অন্তর্গত । ১৯২০-৪০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে বিভিন্ন ডাকাত দল ভীষণ ভাবে সক্রিয় ছিল। এই সমস্ত ডাকাত দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- ভাসাই পাইকরের ডাকাত দল (যার সদস্য সংখ্যা ছিল ১৯২ জন, এরা ৭২টি ডাকাতি করেছিল ), রহমত পাইকরের ডাকাত দল, ভবানীপুর -তোফা পুরের ডাকাত দল (সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৯ জন )। এই সমস্ত ডাকাত দলের সদস্য ছিলেন মূলত নিম্ন-হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের লোক।

হুমায়ুন বাবুর গল্পে উল্লেখিত সাজিরুল বা কার্তিক ডাকাত হয়তো এই রকম কোনো দলের সদস্য ছিলেন। এদের ডাকাতির কর্মকান্ড ধূলিয়ান, ঔরঙ্গবাদ, মালদা জেলার কিয়দংশ, বিহারের বারহারওয়া ও পাকুড় (বর্তমান ঝাড়খন্ড) অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল । সাজিরুল বা শাঁজু থানার বড়বাবুর বদন্যতায় বা পরামর্শে ডাকাতি ছেড়ে বাদশাহী রোডের ধারে চা-তেলেভাজার দোকান করে জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসেছিলেন। সাজিরুল এবং তার স্ত্রী আসিয়া বিভিন্ন তথ্য থানায় সরবরাহ করতেন। ধীরে ধীরে সমগ্র অঞ্চলটিতে ডাকাতদের উপদ্রব কমে যায়। সাজিরুলের নামানুসারে এই অঞ্চলটি কালক্রমে সাজির মোড় বা সাজুর মোড় নামে পরিচিত হয়।

তথ্যসূত্র: ধুলিয়ান ইতিবৃত্ত, সুমিত ঘোষ। লিস্ট অফ এক্টিভ ডাকইট গ্যাং ইন বেঙ্গল ১৯৩০, সি. আই. ডি. নম্বর ৩০৮, ৩১৩, সি. আই. ডি. রেকর্ডস, গভর্নমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল।
সাজুর মোড়ের ইতিকথা সাজুর মোড়ের ইতিকথা Reviewed by Dhuliyan City on 21:42 Rating: 5

আমি ধুলিয়ানের সাধু কিংবা সাধুয়া


আমি ধুলিয়ানের সাধু কিংবা সাধুয়া

              নিতাই মালাকার 

মানিনা-বুঝিনা —
সামাজিক জীবনের ব্যাকরণ ৷
এসেছি কি পৃথিবীতে অকারণ !
বুঝিনা কিছু বুঝিনা —
নিজেকে খুঁজিনা 
নিজের ভেতরে কখনও ৷

চির নগ্ন-নির্জন আমি ৷
অদ্ভুত শান্ত এক সত্তা .....

লোকে কি খোঁজে আমায় !
লোকে কি বোঝে আমায় !
কী-ভাবে বাঁচি আমি প্রতিদিন !

সমাজ-সংসার কিছু বুঝি না !
নাকি বুঝি খুব !
খুব অন্যরকম বুঝি ৷
নিয়ত নিজেকে খুঁজি নিজের ভেতর ৷
বদ্ধতার প্রকাশ্য খাঁচায় মুক্ত আমি —
আশ্চর্য ৷
কে বোঝে —
কে বোঝে না ৷
মন খোঁজে না কিছু খোঁজে না ৷

অদ্ভুত একা আমি ৷
একটি জীবন স্রোত —
প্রশ্ন চিহ্নের মতো বয়ে যাই —
বয়ে যাই ......
চিহ্ন কিছু রাখিনা 
অথবা
চিহ্ন রেখে যাই .......

    ---------------------
ছবি :- অনন্ত সিং

                          সাধু - সাধুয়া 
আমি ধুলিয়ানের সাধু কিংবা সাধুয়া আমি ধুলিয়ানের সাধু কিংবা সাধুয়া Reviewed by Dhuliyan City on 21:18 Rating: 5

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে উৎসকৃত

                        নারী
                   সুমিত ঘোষ
তুমি সৃষ্টিকারী,
তুমি অনন্যা ।
তুমি ঈশ্বরের সুনিপুন সৃষ্টি।
তোমার কত রূপ !
কত রূপে তোমার আগমন।
তোমার গর্ভে আমার অঙ্কুরোদগম,
ধীরে ধীরে শাখা প্রশাখা,
একদিন কোনো এক  তিথিতে,
তুমি জগতের আলো দেখালে,
ধরিণীর বুকে আমার আবির্ভাব,
তোমায় 'মা' বলে ডাকলাম,
তুমি জন্মদাত্রী মা।
তারপর শুধুই পথচলা,
জীবন গাঙের অনেক ঘাটে তোমার দেখা,
তুমি কখনো হৃদয়হরণকারী প্রেমিকা,
তুমি আলো আঁধারের সঙ্গী, সহধর্মিনী,
তুমি আগামী দিনের স্বপ্ন, আমার তনয়া।
প্রবহমান জীবনের আঙিনায়,
সবই যেন সহজাত ।
কোনো এক গোধূলি বেলায়,
তোমার সাথে দেখা,
তুমি আমার প্রেমিকা।
আড়ালে-আবডালে স্বপ্নের জাল বোনা,
জীবনে চলার, তুমি এক নতুন তাগিদ।
সায়াহ্নে বা অপরাহ্নে
তোমার জন্য অকারণ বসন্ত ।
তোমার বিরহে !
কলমের কর্ষণ আর কবিতার বর্ষণ ।
তারপর......
বৃষ্টি ভেজা এক শুভলগ্নে,
তোমার সাথে শুভ পরিণয়,
এ এক নতুন অধ্যায় ।
রোজ নামচায় নতুন ধারাপাত,
কর্ম-চিন্তা-ভাবনায় সীমাবদ্ধতা,
অমাবস্যা-পূর্ণিমার এক অদ্ভুত মধুচন্দ্রিমা,
স্বপ্নময় পৃথিবীতে সসীম পরিধি।
আজ তুমি আবার এলে,
আমার ঘর আলো করতে,
আশার নতুন প্রদীপ জ্বালাতে,
আলোকমঞ্জরীর অসীম মায়া-মমতা,
তুমি আমার দুহিতা
নতুন রূপে তোমার আগমন।
তবু কেন হায় !
আজও অসহায়,
সীতা বা সাবিত্রীর ভূমিকায়,
ধূসর পৃথিবীতে তুমি আজও গদ্যময়।
তোমার চরণ তলে,
শ্রদ্ধার্ঘের পাণ্ডুলিপি মোর,
গ্রহণ কর হে জননী।
উৎসর্গ: নীতি বালা ঘোষ (আমার মা)।
উৎসাহ: ইমতিয়াজ আলী রনি ও অহিদ রেহমান।
অঙ্কন শিল্পী: সন্দীপ ঘোষ।


আন্তর্জাতিক নারী দিবসে উৎসকৃত আন্তর্জাতিক নারী দিবসে উৎসকৃত Reviewed by Dhuliyan City on 21:54 Rating: 5

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে নিবেদিত হলো কবিতাটি


                উড্ডীন পতাকা ওই 
   ________________________________
                  নিতাই মালাকার 

নির্ভীক এগিয়ে চলার
প্রত্যয়ে ওই
পতাকা উড্ডীন ....

শুভ জন্মদিন —
আপনার —
শুভ জন্মদিন !

ছন্দে ছন্দে
গভীর আনন্দে —
এগিয়ে চলার এই যে দিন —
ঊর্মিল দিন .......

শুভ জন্মদিন
আপনার
শুভ জন্মদিন !

দিন দুরন্ত
প্রাণবন্ত
প্রাণের গভীরে বাজে —
পুণ্য বীণ .....

শুভ জন্মদিন
আপনার
শুভ জন্মদিন !

জাগরণ !
এক জাগরণ !
বঙ্গ-চেতনার জাগরণ !
অন্ধকার লীন .....

শুভ জন্মদিন
আপনার
শুভ জন্মদিন ৷

       

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে নিবেদিত হলো কবিতাটি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে নিবেদিত হলো কবিতাটি Reviewed by Dhuliyan City on 01:10 Rating: 5

উত্তরাধিকার তথা মঙ্গল-ছন্দ বিষয়ক


                     
                     নিতাই মালাকার

আশ্চর্য বড় মাপের
মানুষগুলোকে —
অদ্ভুত ব্ল্যাকহোলের হাঁ-য়ে —
ছুঁড়ে ফেলেছি কি আমরা !

যদি না ফেলে থাকি ;
মঙ্গল তবে মঙ্গল ৷

মিথ্যেই তবে, ভেতরের, দুশ্চিন্তার দঙ্গল ৷

বিশ্বমানবতার —
উদাত্ত ছন্দ :
স্বামী বিবেকানন্দ ; — মহৎ কর্মযোগের আনন্দ —
উত্তরাধিকার-সূত্রে রক্ষিত —
আশাকরি, — আমাদের প্রাণে প্রাণে ......

আর —
যদি না রেখে থাকি ;
ঘোর অমঙ্গল ৷
ঘোর অমঙ্গল ৷

সত্যিই তবে, ভেতরের রাত্রির দঙ্গল ৷
প্রহসনে পরিনত উত্তরাধিকার ৷

          --------------------------

   

উত্তরাধিকার তথা মঙ্গল-ছন্দ বিষয়ক উত্তরাধিকার তথা মঙ্গল-ছন্দ বিষয়ক Reviewed by Dhuliyan City on 01:04 Rating: 5

"সাধুয়া--এক অনন্য জীবন দর্শন " সুমিত ঘোষ

সাধুয়া - "নোংরা এঁদো গলি হোক বা শীত কালের হরেক রকম ফুল দিয়ে সাজানো ছাদ হোক,
শীতের জড়তা কাটানো একফালি রোদ,
বড়ই মিষ্টি "
কিন্তু, এতো আমার-তোমার অনুভূতি, ভালোলাগা । হার কাঁপানো চরম শীতে, বর্ষণ সিক্ত দিনে বা গ্রীষ্মের কাঠ ফাটা গনগনে রোদ, এ সবেই তার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি, খালি গা, পরনে শুধু একটা হাফ প্যান্ট । এ এক এমন  অদ্ভুত ও অত্যাশ্চর্য মানুষ আমাদের ধুলিয়ান শহরের সকলের পরিচিত 'সাধুয়া' ।

কে এই 'সাধুয়া' ? কি তার পরিচয় ?

আশির দশকে কাঞ্চনতলা হাইস্কুলে পড়ার সময় তাকে প্রথম প্রত্যক্ষ করি । শুরুর দিকে ভয় পেয়ে এড়িয়ে যেতাম । পরে বুজতে পারি 'সাধুয়া' আমার তোমার মত একটা মানুষ, তবে সে নির্ভেজাল, নির্বাক, নির্ভীক এবং নিঃসন্দেহে 'পয়া' । পরীক্ষার সময় 'সাধুয়া' কে দর্শন মানে, পরীক্ষাই ভালোভাবে উতরে যাওয়া ।  এরপর দুর্গাপুজোর বিসর্জনের শোভা যাত্রার পেছনে বা মহরমের তাজিয়ার পেছনে 'সাধুয়া' র উপস্থিতি, অতি সাধারণ ঘটনা । স্কুল পেরিয়ে আমরা ছোটো থেকে বড় (বয়সে) ক্রমে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছি কিন্তু 'সাধুয়া' নট আউট ব্যাটসম্যান থেকে গেছে । আজও তার বিরামহীন বিচরণ । প্রভাতী নগর কীর্তনের পেছনে হয়তো "হরে কৃষ্ণ" কীর্তন মনে মনে গেয়ে যায় বা নামাযের সুরে "আল্লাহ হু আকবর" বির বির করে উচ্চারণ করে, সে ঈশ্বরের উপাসনা করে । কে জানে ! 'সাধুয়া' র কাছে হয়ত যাহাই 'কৃষ্ণ' তাহাই 'আল্লাহ' ।
'সাধুয়া' আমার কাছে এক অনন্য জীবনদর্শন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, কোনোটিই কখনো তাকে বিচলিত করেনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অমাবস্যায়, আমাদের  'সাধুয়া' যেন পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ ।

সাধারণ মানুষের মধ্যে ষড়রিপুর ছয়টি গুণ অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য বর্তমান থাকলেও 'সাধুয়া' র মধ্যে এ হেন কোনো জাগতিক চাহিদা বর্তমান আছে কিনা, তা প্রশ্নাতীত । এছাড়া ভারচুয়াল জগতের ছোঁয়াচে রোগ , যেমন  facebook ,instagram, twitter, YouTube আর whatsapp  এগুলো কোনটিই 'সাধুয়া' কে আক্রমণ করতে পারেনি, এটা হলফ করে বলায় যায়।

পরকালে 'সাধুয়া' র স্থান হয়তো 'জান্নাত'-এ বা 'স্বর্গে' ঠাঁই হবে কিন্তু ইহকালে সে 'একলা একলব্য' । 'সাধুয়া' আজও একই ভাবে অবাধ ভাবে বিচরণ করে চলেছে । রবি ঠাকুরের 'একলা চলো রে' তার জন্য যথার্থ ।
আমার তোমার 'সাধুয়া' দীর্ঘজীবী হোক । 'সাধুয়া' র জন্য উপহার রইল শীতের মিঠে রোদ, গ্রীস্মের হিমেল বাতাস আর আমার শ্রদ্ধা যা হয়ত তাকে বর্ষার অবিরাম বর্ষণে ছাতির রূপ নেবে ।

সুমিত ঘোষ ।
ছবি: পলাশ

"সাধুয়া--এক অনন্য জীবন দর্শন " সুমিত ঘোষ "সাধুয়া--এক অনন্য জীবন দর্শন "
সুমিত ঘোষ Reviewed by Dhuliyan City on 00:44 Rating: 5

নিমতিতার বাবুবাড়ি ও শালুবুড়ি অন্তিম পর্ব

10:08

বামুনঠাকুরের কথা শুনে অমিত কে নিয়ে বেরিয়ে পরে নরেন কাকা জঙ্গীপুরের উদ্দেশ্যে। ফটোগ্রাফির ভুত কবে নেমে গেছে অমিতের ঘাড় থেকে। এখন মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন খিল দিচ্ছে  কেন যে এসব ভুতুড়ে জায়গায় এলো? যেমন করেই হোক সুমনককে বাঁচাতে হবে। নরেন আগেও প্রয়োজনে দুবার এসেছে শালুবুড়ির কাছে।
আসুন তবে শালুবুড়ি নিয়ে কিছু জেনে নেওয়া যাক।

জঙ্গীপুরের কাছে আহিরন গ্রামেই থাকেন সৈয়দ সালমা বেগম। লোকে তাকে শালুবুড়ি নামেই চেনে। বয়স প্রায় ষাট ছুই ছুই। বছর পনেরো আগেই পীর স্বামীর নিধন হয়েছে। আহিরন গ্রামের কাছেই একটা ছোট্ট জায়গায় ওনার দরগাহ। গ্রামের লোক তাকে পীর মা বলেই সম্বোধন করে।
রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা, বহরমপুর, ধুলিয়ান, ফারাক্কা, কালিয়াচক এলাকার লোক তাকে এক নামেই চেনে। তার অদ্ভুত অদ্ভুত কীর্তির কথা কে না জানে। পীর বাবার কাছেই দীক্ষা লাভ করেছেন তিনি। কোরানের সব কঠিন কঠিন আয়াত এবং দুস্পাঠ্য সুরা তাঁর ঠোঁটস্ত।

দুস্পাঠ্য এজন্য বললাম, ইসলাম পুরানশাস্ত্রে এমন এমন কিছু সুরা বা মন্ত্র আছে যে গুলো সঠিক নিয়ম অনুযায়ী পাঠ না করলে ফল বিপরীত অথবা ভয়ঙ্কর হতে পারে। উদাহারণস্বরুপ আয়তাল কুরছি সুরা। এই সুরাটি তিন বার পাঠ করলে জিন, ভুত, প্রেতাত্মা অথবা যে কোনো অলৌকিক শক্তি ভস্ম হয়ে যাবে। তবে এটাকে পাঠ করার জন্য পবিত্র দেহ এবং মনের অধিকারী হতে হবে। আর এই সুরাটি উলটো অক্ষরে কেউ যদি পাঠ করে তাহলে যে বা যিনি পাঠ করছে, তিনি নিজেই তীব্র আগুনে ভস্মীভূত  হয়ে যাবেন। হিন্দু শাস্ত্রে হনুমান চাল্লিশার যা মাহাত্ম্য, ইসলাম শাস্ত্রে আয়তাল কুরছির মাহাত্ম্য এক।

যাই হোক, আপনাদের পুরানের কথা বলতে বলতে  নরেন  কখন যে পৌছে গেছে বুঝতেই পারিনি।

দরগাহটা একদম ফাঁকা জায়গায় অবস্থিত। চারিদিকে খাঁ খাঁ মাঠ। গ্রাম থেকে প্রায় দু কিলোমিটার বাইরে NH -34 এর কাছে একলা পড়ে আছে এক চিলের দরগাহ। দরগাহর চার পাশে দশ-বারো টা শিশু গাছ যেন দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে । কাছাকাছি একটা দোকানও নেই।

ছোট্ট মাজারের চৌকাঠে পা রাখতেই একটা ভারী গলার শব্দ শুনতে পায় তারা।
"--না পাক শরীরে দরগাহতে প্রবেশ করবি না। ওইখানে ওজু করার জল আছে।  ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে আয়।"
সামনেই দাঁড়িয়ে কালো বোরখা পরিহিতা, চোখে চওড়া করে সুর্মা দেওয়া অসম্ভব সুন্দরী এক প্রৌড়া। তাকে কোনো ভাবেই দেখে বলা যাবে না যে ইনি ষাট বছর বয়সী। বোরখার ভেতর থেকে কাঁচা পাকা চুল গুলো উঁকি মারছে, চোখে অদ্ভুত এক আকর্ষন এবং আত্মবিশ্বাসের ছাপ।
অমিত কিছু বুঝে ওঠার আগেই নরেন কাকা তাকে চোখের ইশারায় বোঝাতে চেষ্টা করলেন, ইনিই হচ্ছে সেই শালুবুড়ি।

হাত মুখ ধুয়ে দরগাহর ভেতরে প্রবেশ করতেই শালুবুড়ি বলে উঠলেন,
"--কাল যেটা হয়েছে হয়েছে মোটেই ভালো হয়নি। ওই ছোঁরার কুঠির কাছে যাওয়া উচিত হয়নি। তার ওপর জায়গাটাকে অপবিত্র করেছে আবার। অন্যায় করেছে ও। দেড়শ  বছরের পুরোনো শক্তিশালী জিন কে মুক্ত করেছে ওই ছোকরাটা।"
কথাগুলো শোনা মাত্রই তাঁর চরনে ষাষ্টাঙ্গ প্রনাম করে কান্নার সুর ধরে অমিত।
--"রক্ষা করো মা। আমাদের চরম বড় ভুল হয়েছে ওই ঘরটায় ঢুকে।  আমার বন্ধুর প্রান এখন আপনার হাতে"
অমিতকে ঘাড় ধরে উঠিয়ে আশ্বাসন দেন পীর মা।
--"এখন যা যা বলছি সেটা করবি" বলেই একবাটি জলে নিয়ে সেটাতে বিড় বিড় করে কি সব মন্ত্র পড়া শুরু করেন তিনি।
একটু অবাক হয়েই একে অপরের মুখে চেয়ে থাকে অমিত ও নরেন কাকা।
--"এখন যা। এই পানিটা বোতলে ভরে নিয়ে যা। আজ রাতে ঘুমাবার সময় ওই ছেলেটাকে খাইয়ে দিস। আর সব থেকে বড় কথা,  ছেলেটাকে চোখে চোখে রাখিস আজকের দিনটা। আমার কিছু কাজ আছে। কাজ মিটিয়েই আমি কাল আসব ওখানে। "

আমরা অনেকে জলপড়া র নাম শুনেছি। অনেক তান্ত্রিক, মৌলবি আছেন যারা রোগ নিবারনের জন্য বিশেষত দিয়ে থাকেন। কিন্তু এই জলপড়া আত্মা শুদ্ধিকরনের জন্যও অনেকে ব্যাবহার করেন। যাতে কোনো অশরীরী আত্মা বা প্রেত দেহের ওপর ভর না করতে পারে।
এই হচ্ছে সেই জলপড়া।

যাই হোক, তারা ওখান থেকে শালুবুড়ির দেওয়া জলপড়া নিয়ে চলে যায়।
বাড়িতে এসে অমিতের চোখে পড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য। বাড়ির দেওয়ালে সুমন কয়লা দিয়ে একের পর এক ছবি এঁকে যাচ্ছে। কিন্তু সুমন বাপজন্মেও কোনোদিন ছবি আঁকেনি। এত সুন্দর সুন্দর ছবি,  যা না দেখলে বর্ননা করা যায় না, এটা কি করে সম্ভব? ভয়ে তটস্থ মামার বাড়ির লোক সুমনের কাছে ভিড়তে পারছে না।
দেওয়াল নোংরা হচ্ছে হোক, প্রানে বাঁচতে পারলেই হলো।

নরেন কাকার কথায় লক্ষীপন্ডিতের কাছে আবার ছোটে অমিত।

--"পন্ডিতমশাই, আপনি নিশ্চয় কিছু লুকোচ্ছেন। সুমনের এই হঠাত করে ছবি আঁকার অদ্ভুত প্রতিভা কোথা থেকে এলো?"
অমিতের কথায় হাড় হিম হয়ে যায় লক্ষীবামুনের। চমকে ওঠেন তিনি।
মাথায় কয়েকটা চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলেন,
--" তবে কি ঐ মহেন্দ্রনারায়ন...
--"কে মহেন্দ্রনারায়ন,?  একটু খুলে বলবেন?  ব্যাপারটা না জানলে এই সংকট থেকে পার পাওয়া মুশকিল পন্ডিতমশাই।"
--"তবে শোন হে বাছা।"
পুরো এক ঘটি জল গট গট করে খেয়ে বলা শুরু করলেন লক্ষীবামুন।

"আমার ঠাকুর্দার মুখে শোনা। আমার ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা তখন এই জমিদার বংশের কুল পুরোহিত।
দ্বারকানাথ পুত্র মহেন্দ্রনারায়ন তখন নিমতিতা রাজবাড়ির জমিদার। কি তেজ না ছিলো তার। যেমন তার সুদর্শন চেহারা, তেমনি তার গ্রামের লোকেদের প্রতি দরদ। 
সেই সময় এই মহেন্দ্রনারায়নের বেশ নাম ডাক ছিলো।
রাজ্যের তাবড় তাবড় জমিদারেরা এই নিমতিতায় আসতেন তাঁর কাছে। নাট্য অভিনয়ে বেশ পটু ছিলেন তিনি। বঙ্কিমচন্দ্রের বেশ কয়েকটি নাটক তিনি ঐ হিন্দু থিয়েটারে মঞ্চস্থ করে ছিলেন। ইংরেজ সাহেবদের সাথেও বেশ ভালো পরিচয় ছিলো তাঁর। তাঁর আমলেই শুরু হয় নিমতিতায় রেল পরিসেবা।
তবে অভিনয় ছাড়াও মহেন্দ্রনারায়নের আর একটা শখ ছিলো। অবসর সময়ে দুপুর বেলায় তিনি ছবি আঁকতেন।
দুর্গাপুজোর বিরাট মেলাতে হতো তাঁর আকা ছবির প্রদর্শনও। অনেক নামী নামী বড়লাটেরা চড়া দামে কিনতো তাঁর ছবি।
একবার মেলায় তার অঙ্কন প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বিবাহ নিবেদন করেছিলো ওই মেয়েটি"
পন্ডিত মশয়াইয়ের কথায় বিঘ্ন ঘটিয়ে অমিত জিজ্ঞাসা করলো--"কোন মেয়েটি?
--"অপরুপ সুন্দরী রমণী। সাক্ষাত স্বর্গের কোনো অপ্সরার মতো। কেউ জানে না সে কোথা থেকে এসেছিল। নিজের নাম নয়নতারা জানিয়েছিলো সবাইকে।
তো তার সেই রুপে মুগ্ধ হয়ে বিবাহে ইতিবাচক ইশারা দেন যুবক জমিদার। জাত, গোত্রের বাচ বিচার না করেই খুব শীঘ্রই ওই অজ্ঞ্যাত পরিচয় কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে লিপ্ত হন তিনি।

নিমতিতার লোকেদের কানাঘুষি শোনা যায় রাস্থায় রাস্থায়, জমিদার নাকি বশীকরণের শিকার হয়েছেন।
কথায় বলে না, সত্য কখনো লুকোনো যায় না। সেদিন গভীর রাতে হঠাত ঘুম ভেঙে যাওয়ায় পাইচারি করার জন্য রাজবাড়ির বারান্দায় এসে জমিদার দেখতে পান নয়নতারা নামাজ পড়েছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি। মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন আঘাত করতে থাকে, তবে কি সে বিধর্মী কে বিবাহ করেছ?
ধর্মের প্রতি কোনো কালই বাচ বিচার করা তার অভ্যাস ছিলো না। কিন্তু মেনে নিতে পারেন নি নয়নতারার বিশ্বাসঘাতকতা। সে রাতে ঘুমাবার সময় একটা কথায় খটকা লেগেছিলো তাঁর। নামাজের পাঁচটি সময় তার জানা আছে কিন্তু মাঝরাতে তো কারোর নামাজ পড়ার কথা নয়। স্ত্রী কে কিছু না বলেই শুয়ে পড়েন তিনি।
পরের দিন ভোর বেলায় ঘুম ভাঙতেই ছুটে যান এলাকার সব থেকে জব্বর ওঝা বোরজান মোল্লার কাছে।
তাকে সব কথা খুলে বলতেই তিনি বলেন এ কোনো সাধারন মহিলা নয়। এ একটা শক্তিশালী জিন্নাত বা জিন। বোরজান ওঝা রাজবাড়িতে গিয়ে নয়নতারার আসল রুপের ব্যাপারে জানতে পেরে কি না কি সুরা অথবা কলমা পড়ে তাকে কুঠীবন্ধ করেছিলেন। আর একট সতর্কবানী হিসেবে  কুঠী ঘেঁষে কাউকে মল মুত্র ত্যাগ করতে বারন করেছিলেন। তার পরে কোনোদিনো ওই জিনের উপদ্রব বোঝা যায়নি।  কিন্তু এত দিন পরে আবার কি করে যে আবার ওই শক্তিশালী জিন জাগ্রত হলো বুঝতে পারছি না।"
গপ্পো বলতে বলতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে বুঝতে পারেনি তারা। পেছন থেকে হঠাত একটা অদ্ভুত মানুষের মতো কণ্ঠস্বর।
--"হ্যা ঠিকই ধরেছিস পন্ডিত।"
চমকে গিয়ে পেছনে ঘুরে কাউকে দেখতে পায় না অমিত। কিন্তু যখনই নিচের দিকে তাকালো বুকের কলেজাটা উলটে যাওয়ার অভিপ্রায়।
অমিতের হাঁটুর থেকেও কম উচ্চতার একজন সাদা আলখাল্লা পড়া মাথাটাও সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা এক গাল বিশাল লম্বা দাড়ির মানুষ দাঁড়িয়ে যার মুখটা সুমনের আর দেহটা অন্যকারোর। সাথে খিল খিল করে হাসি।
"এবার আমি মহেন্দ্রকে ছাড়ছি না। তোরা হাজার চেষ্টা করেলেও আমাকে আটকাতে পারবি না। এবার আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না।"
বলতে বলতেই বিদ্যুৎ গতিতে বাবুবাড়ির দেওয়ালে চেপে কোথায় যেন মিশে গেলো অদ্ভুত প্রানী টা।
                     ******-*******
এরপর বেশ কয়েক ঘন্টা কেটে গেছে। সুমনের বাড়ি থেকে ফোন এসেই চলেছে। সুমন কোথায় আছে কেউ জানে না। মামার বাড়ির লোক থানায় রিপোর্ট করেছে। কাল সুমনের বাড়ির লোকেরা আসবে এখানে।

ঘড়ি বলছে রাত একটা বাজে এখন। ধীরে ধীরে তন্দ্রায় বুজে আসছে অমিতের চোখ।
--"এ্যই অমিত, আমকে মিষ্টি খাওয়াবি? "
এতো খুব চেনা গলায় আওয়াজ অমিতের। হ্যা এতো সুমনের গলার স্বর।
আবার সেই একই গলা।
--" আমাকে একা ছেড়ে চলে গেছিস? এদিকে আয়? এখানে আইইইইইইইইইইইইইই।"।
কোথায় ডাকছে সুমন? অমিত যেন হেঁটেই চলেছে সুমনের পিছু পিছু গভীর জঙ্গলের মাঝ দিয়ে।
ঘুমের মধ্যেই বুঝতে পারে এই তো সুমন নয়। ঘুম ভাঙছে না কেন? চোখ খুলেও বুঝতে পারছে সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে রয়েছে। অনেক শক্তি দিয়েও হাতা পা নাড়াবার চেষ্টা করলেও নাড়াতে পারছে না। এ তো নিশ্চয় ভুলো অথবা বোবার ঘোর।
এ ঘোর কাটতেই চাইছে না তার। তাকে যে করেই যে স্বপ্নটা ভাঙাতেই হবে।
দ্রুত গতিতে হেঁটেই চলেছে সুমনের পিছু পিছু। এমন প্রতীত হচ্ছে যে সময়ের বেগ কমে গিয়েছে। 

হঠাত সুমনের সামনে একটা কালো বোরখা পরা মহিলা রুখে দাঁড়ালো। সাথে তীব্র বাজ পড়ার শব্দ।
অবাক কান্ড। এ তো শালুবুড়ি। অমিতের স্বপ্নের মধ্যে কি করে প্রবেশ করলো।

শালুবুড়ি ফিসফিস করে দু বার মন্ত্র পড়ে ফু দিতেই সুমন ছিটকে পড়ে গেল সজোরে।   সাথেই সাথেই একঝটকায় ঘুম ভেঙ্গে চমকে বসে পড়লো অমিত। মাথাটা ডান দিকে ঘুরাতেই দেখে শালুবুড়ি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার চোখের দিকে। আর তাঁর পাশে ভয়ার্ত চিত্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে নরেন কাকা এবং সুমনের মামার বাড়ির লোক জন।
--" পীর মা, আপনার তো কাল আসার কথা ছিলো। আপনি কি করে..
অমিতকে মাঝপথেই হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিয়ে বললেন তিনি,
--আশরাফ আমাকে সব বলেছে। আমকে যা করতে হবে এক্ষুনি করতে হবে। তোরা এক্ষুনি এক কাজ কর। গঙ্গার ঘাটে গিয়ে একটা পরিস্কার নৌকা রেডি কর। আমি আসছি ওখানে। " বলেই শালুবুড়ি দু বার হাত তালি মারলেন আর সাথে সাথেই একটা হাওয়ার ঝটকা জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
ভয়ে প্রান শুকিয়ে গেছে অমিতের। আগাগোড়া কিছুই বুঝতে পারলো না।  কে আশরাফ, কোন আশরাফ কিচ্ছু বোঝা গেলো না।
পীর মায়ের কথা মতো অমিতরা গঙ্গার ধারে একটা নৌকা পরিস্কার করে বসলো তার ওপর।

রাত প্রায় দু টো। জোৎস্নার আলো মেখে পবিত্র গঙ্গার জল ঝিক ঝিক করছে। কিছুক্ষন পরেই শালুবুড়ি এলেন নৌকার ওপরে। নৌকার একপাশে শালুবুড়ি সহ সবাই বসে আছে। এবার শালুবুড়ি আরবি ভাষায় পাঠ করতে শুরু করলেন কোরানের বাহাত্তর নম্বর সুরা। #সুরা_জিন।

থুরি, সুরা জিনের ব্যাপারে আপনাদের বলাই হয়নি।
সুরা জিন হলো কোরানের অন্যতম শক্তিশালি সুরার মধ্যে একটি। এটি সাতশো বার পাঠ করলে জিন কে নিজের বশে করা যায়। একশো থেকে দেড়শোবার পাঠ করলেই মানুষ খালি চোখে জিন দেখতে পায়। এ সুরা যে কেউ পাঠ করতে পারে না। সিদ্ধি লাভ করা কোনো ব্যাক্তির পক্ষেই এ সুরা পাঠ করা সম্ভব। অতীতে এটি পাঠ করতে করতে অনেকেই নিজেই ভস্মীভূত হয়েছেন। এই সুরা পাঠ করার জন্য যথার্থ সাহস থাকা চায়।

    প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেছে।  এখন প্রায় রাত তিনটে বাজে। শালুবুড়ির তীব্র গতিতে সুরা পাঠ চলছেই স্পষ্ট উচ্চারনে। হঠাত দেখা যায় নদীর তীরে সাদা জ্বল জ্বল করা গুটি কয়েক ছোট ছোট মানুষের মতো। উচ্চতা প্রায় দু ফুট হবে। মুখ গুলো ঠিক করে বোঝা যাচ্ছে না।
তাদের মধ্যে একজন নিজে থেকেই অমিতদের নৌকাতে এসে ঝাঁপ দেয়। শালুবুড়ি মন্ত্র পড়া থামায়নি এখনো। বুঝে উঠতে দেরি হয়না অমিতের যে ঐ প্রানীটি জিন ছাড়া আর কিছুই না।
গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায় অমিতের।

এবার শালুবুড়ি সুরা পাঠ বন্ধ করে মাঝিকে নির্দেশ দেন নৌকা মাঝ নদীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নৌকা মাঝ নদীতে আসে। থর থর করে কাঁপছে বিপরীত দিকে বসে থাকা ছোট্ট প্রানীটি।

শালুবুড়ি তখন রক্তচক্ষু। তার পুরো শরীর থেকে যেন একটা গরম ভাপ বেরোচ্ছে অনুভব করতে পারে পাশে বসে থাকা অমিত। এবার শালুবুড়ি ঐ জিনের দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় বলে,
--" ছেড়ে দে ওই বাচ্চাটাকে। "
--" দেড়শো বছর অপেক্ষা করেছি মহেন্দ্রনারায়নের জন্য। এই বুড়ি, তুই আমার কিচ্ছু করতে পারবি না। সুরা জিন পড়ে আমাকে নিয়ে তো এসেছিস এখানে। কিন্তু আমি গেলে মহেন্দ্রকে আমার সাথে নিয়েই যাবো।" সাথেই ভয়ঙ্কর অট্টহাসি।
এক বার একটু মুচকি হাসি হেসে শালুবুড়ি বলে উঠলেন,
--তবে ছাড়বিনা বলছিস। আগের বার তুই প্রানে বেঁচেছিস। এখন পালাবি কোথায়। তোর পালাবার আর জায়গা নেই যে। গঙ্গার মাঝে আছিস তুই।  কোনো প্রেতাত্মা, জিন, ভুত, ডাইনি, ভুলো গঙ্গা পার করার ক্ষমতা রাখে না। এক্ষুনি আমি "আয়তাল কুরছি" পাঠ করে তোকে ভস্ম করে দেবো। " কথাটা বলা মাত্রই শালুবুড়ি খুব জোরে জোরে স্পষ্ট উচ্চারণে পাঠ করতে শুরু করলেন কোরানের সব থেকে শক্তিশালী সুরা আয়তাল কুরছি।
সামনে বসে থাকা ওই জিন্নাতটি সঙ্গে সঙ্গে সুমনের রুপ ধারন করলো। তীব্র আর্তনাদের সাথে চলতে থাকলো প্রান ভিক্ষা।
তা দেখে প্রিয় বন্ধু অমিত আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না। অমিত উঠতে যাবে এমন সময় কেউ যেন হাত টা শক্ত করে ধরলো তার। এ যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি। নাড়াচাড়া করার উপায় রইলো না তার।
এদিকে সুরা পাঠ চলছেই। সুমনের অবস্থা বর্ননা করা যাচ্ছে না। মুখটা অনেক বড় করে হাঁআ করে আছে সে। মুখ থেকে কিচ্ছু শব্দ বের করতে পারছে না সে।

শেষের দু লাইন পড়ার পরে শালুবুড়ি  সুমনের দিকে খুব জোরে ফু দিলেন। আর ওমনি তার দেহ থেকে বেরিয়ে গেলো একটা কালো ছায়া আর গঙ্গার স্থির জলের ওপর আচমকা একটা ঢেউ বয়ে গেলো।
নৌকার ওপরেই লুটিয়ে পড়ে সুমন। শালুবুড়ির মুখ থেকে শোনা শব্দে বুকের স্পন্দন গতি ধীরে হয় অমিতের।
--" এখন সব ঠিক আছে। ওকে ছেড়ে দে আশরাফ"।
বন্ধন মুক্ত হয় অমিত। অবাক হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে শুরু করলো সে।

সেদিন সকাল ছ'টায় শালুবুড়িকে বিদায় জানানোর জন্য জনা পঞ্চাশেক গ্রামের লোক জড়ো হয় নিমতিতা স্টেশনে।
--" এখন আপনাদের এই বাবুবাড়ি সম্পুর্ণভাবে নিরাপদ। প্রত্যেকদিন দরজা খুলতে পারেন। আর সরকারকে একটা চিঠি লেখে মেরামত করানোর বন্দোবস্ত করুন বাংলার এই ঐতিহ্যকে। " লক্ষীবামুনের উদ্দেশ্যই কথা গুলি বলেন শালুবুড়ি।
পাশেই সুমন ও অমিতকে দাড়িয়ে দেখে আরো বলেন -"এবার তোমারা ভালো করে ছবি তুলতে পারো এখানে।"
অমিতের চেহারায় প্রশ্নের ছাপ দেখে জিজ্ঞাসা করেন তিনি
--কিছু বলতে চাও?"
--"না মানে সবই ঠিক আছে, কিন্তু আশরাফের ব্যাপারটা বুঝলাম না। "
ফিক করে একটু হেসেই জবাবটা দিলেন তিনি
--" আশরাফ আর কেউ না। ও আমার পোষ্য জিন।।আমার দেহরক্ষী। সেদিন তোমাদের সাথেই গাড়িতে পাঠিয়ে ছিলাম আমি, যাতে তোমাদের অশুভ শক্তি কিছু করতে না পারে।"
বুকের মধ্যে একটা বরফ ঝড় উঠলো অমিতের।

(সমাপ্ত)

সৌজন্যে ©Shahnawaz Haque

নিমতিতার বাবুবাড়ি ও শালুবুড়ি অন্তিম পর্ব নিমতিতার বাবুবাড়ি ও শালুবুড়ি
অন্তিম পর্ব

Reviewed by khokan on 10:08 Rating: 5
Powered by Blogger.