#পায়েল_চক্রবর্তী
রাগে হনহন করে হাঁটছিল তৃণা,সৌরভ আসছিল পিছুপিছু। CC2 এর বাইরে ফাঁকামত জায়গা পেয়ে ব্যাগটা ঝনাৎ করে রেখে বসল তৃণা।সৌরভ অনেকটাই পিছনে পড়ে গেছিল,ভীড়ের মধ্যে ইতিউতি তাকাচ্ছিল,মেয়েটা গেল কোথায়!
শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেল,তৃণা এক কোণে গোঁজ হয়ে বসে। "ভাগ্যে দুঃখ আছে আজ!" বিড়বিড় করতে করতে এগোল সৌরভ। পাশে বসে গলাটা হাল্কা ঝেড়ে নিল
-"এত রাগ করার কি হয়েছে?এমনি তো হতেই পারে!"
তৃণা কটমট করে তাকালো সৌরভের দিকে, রাগে গনগন করছে মাথা তার,তার ওপর বলছে হতেই পারে! ইয়ারকি করছে না কি ওর সাথে? না! এক মিনিট ও আর থাকবে না ও এখানে। তৃণা উঠে দাঁড়াল,সৌরভ সঙ্গে সঙ্গে খপ করে ধরেছে হাতটা-
-"ছাড় বলছি!" তৃণা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।
-"রাগ কেন করছিস মিঠাই,বললাম তো সরি!"
-"ওহ সরি বললেই সব মিটে গেল?"
-"আরে,আমি নিজেই জানিনা কখন..."
-"আ্যহ,উনি জানেন না! শোন,তুই একটা লোককে দেখা দেখি,যে তার গার্লফ্রেন্ডর সাথে সিনেমা দেখতে গিয়ে নাক ডেকে ঘুমোয়?"
-"বিশ্বাস কর আমি ইচ্ছে করে...."
তৃণা হাত তুলে থামায়
-"অনেক হয়েছে,আর নয়। একেতো কাল রাতে উইশ করিসনি আমায়,বেলা দশটায় মনে পড়ল তোর যে,আজ জন্মদিন আমার!"
সৌরভের অবস্থা কাহিল,তৃণার রাগ করাটা স্বাভাবিক,কিন্তু তার সমস্যা হল,এই ডেট ফেট গুলো ছাতা তার কিছুতে মনে থাকেনা!তবু সকালে মা ভাগ্যিস মনে করিয়ে দিয়েছিল!নইলে হয়েছিল আর কি।
তৃণা অভিযোগের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। সৌরভের উপায় ও নেই চুপ করে শোনা ছাড়া।
-"শোন,আর এভাবে সম্ভব নয়। আজও একঘন্টা লেটে এলি। আমায় কি পেয়েছিস হ্যাঁ? its over! I'm breaking up with you!"
-"ওহ্"
-"ওহ্!আচ্ছা মানে তুইও সেটাই চাস!" তৃণা তেড়ে আসে।
-"আরেহ আমি কখন বললাম?তুইই তো কথায় কথায় ব্রেকআপ করিস। এক বছরে এই নিয়ে দশবার হল!"
-"এবারেরটা ফাইনাল!শুনলি?"
-"ও,আচ্ছা!"
গা জ্বলে গেল কথাটা শুনে তৃণার। ছেলেটাকে গাধা,গরু,ভেড়া, ছাগল কি যে বলবে ভেবেই পেল না সে।
একটা ল্যাদখোর,মাথামোটা, expression less ছেলে সে দুটো দেখেনি!!একনম্বরের লেটলতিফ,ঘরকুনো ছেলে।
সকালে আদিখ্যেতা করে মুভি দেখানোর প্ল্যান করা হয়েছিল!
তৃণা এবার কোনো কথা না শুনে হনহন করে হাঁটা লাগাল।
পিছনে সৌরভের গলা আসছিল,
-"মিঠাই,শোন, মিঠাইইই...."
তৃণার মাথা জ্বলছিল,সে কোনো উত্তরই দেয়নি। খানিকটা এগিয়েই একটা শোরগোল শুনতে পেল,ঠিক তক্ষুনি একটা বাস হুস করে বেরিয়ে গেল পাশ দিয়ে।
একটা লোক ওদিক থেকে আসছিল,তাকে পাকড়াল তৃণা।
-"কি হয়েছে দাদা,গন্ডোগোল কিসের?"
-"আরে একটা ছেলে ধাক্কা খেয়েছে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে!মাথাটা ফেটেছে মনে হয়,শালা,ড্রাইভার গুলো,বাপের রাস্তা ভাবে!"
লোকটার কথা কিচ্ছু কানে যাচ্ছিল না তার,সৌরভ টা.... ও ঠিক আছে তো?
-"দাদা ছেলেটা কি রকম দেখতে?কি পড়েছিল কিছু দেখেছেন?" গলা কাঁপছিল তৃণার!
-"নানা যা ভীড় দেখব কি!তবে মনে হল, কালো জামা! "
সর্বনাশ!সৌরভ ও তো...এই তো সেদিন ইউনিভার্সিটির সামনে প্রায় ধাক্কা খাচ্ছিল ট্যাক্সিতে; তৃণাই হ্যাঁচকা দিয়ে সরিয়ে আনে সেদিন। আত্মভোলা ছেলে একটা!
তৃণা ব্যাগ ট্যাগ ফেলে দৌড় দিল,কৌতূহলী লোকজনদের ভীড় ঠেলে এগোতে এগোতে তৃণার মনে হচ্ছিল ও নিজেই পড়ে যাবে এবার! বুকটা খালি হয়ে যাচ্ছে...সৌরভ ছাড়া ও থাকবে কি করে,কাকে ভালবাসবে, কার ওপর রাগ করবে,অভিমান করবে!
অনেক কষ্ট করে সামনে গিয়ে দেখল ছেলেটা অপরিচিত। যাক শান্তি।
কিন্তু তারপরেই বুক ছ্যাঁত করে উঠল! ব্যাগ? ব্যাগ কই?মনে পড়ল,ব্যাগটাকে রাস্তাতে.....
আবার দৌড় লাগাল তৃণা,ইসস টাকা,ফোন সব গেল ওই শয়তানটার জন্য! একবার সামনে পেলে দাঁত খুলে হতে ধরিয়ে দেব!
হ্যাঁ,ঠিক নেই ব্যাগটা,নির্ঘাত কেউ ঝেঁপে দিয়েছে!
কান্না পাচ্ছিল তৃণার। সবচেয়ে খারাপ জন্মদিন এটা তার!
"এই মিঠাই!" চেনা গলা শুনে চমকে পেছন ফিরে দেখে সৌরভ!কাঁধে তার ব্যাগ!
-"আমি তো তোর পেছন পেছন আসছিলাম,হঠাৎ দেখি,তুই ব্যাগ ফেলে বিরহসন্তপ্ত রাধিকার মত দৌড়লি!"
এখনও ইয়ারকি! তৃণা রাগে ফেটে পড়ে! রাস্তাতেই ব্যাগ দিয়ে পেটাতে থাকে সৌরভকে
-"ছাগল কোথাকার,উল্লুক,বাঁদর ইয়ারকি করছিস!তোকে আজ মেরেই ফেলব।"
-"আরে আরে কি করছিস,লোকজন দেখছে!আমায় ইভটিজার ভাববে!"
-"তুই জানিস!আমার কি হচ্ছিল!জানিস তুই!" কেঁদে ফেলে তৃণা।
সৌরভের বুকে মুখ গুঁজে!
-"কি ভেবেছিলি?আমি...."
-"চুপ!খবরদার বলবি না।"
-"তবে যে ব্রেকআপ বলছিলি!"
-"তুই কেন জন্মদিন ভুলবি! কেন হলে বসে ঘুমোবি!"
-"আমি তো এরকমই মিঠাই,অগোছালো, এলোমেলো! তুই নাহয় শুধরে নিস।....... আমার সারাজীবনের পাগলী হবি?"
-"কি!" তৃণা বুক থেকে মুখ তুলে তাকায়।
তারপর তাকে অবাক করে সৌরভ রাস্তাতেই হাঁটু মুড়ে বসে পকেট থেকে একটা ছোটো বাক্স বের করে।
তৃণার হার্টবিট বাড়ছে...
একটা রিং....
আবার তৃণা কাঁদছে। সৌরভ ওর চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলে
-"এজন্য দেরী হল আজ! .....বললি না তো,আমার সারাজীবনের পাগলী হবি?"
তৃণার মাথা আস্তে আস্তে সৌরভের বুকে নুয়ে এল....
-"কি রে বল?"
আদুরে গলায় উত্তর এল
-"জানিনা যা!গাধা কোথাকার..."
-সমাপ্ত-
No comments: