লেবার রুম থেকে বেরিয়ে এসে সিস্টার বললেন
-"ও দিদি, আপনার নাতনি হয়েছে"।
খবরটা শুনে আনন্দে মেতে উঠল কৃষ্ণা।
-"যাক বাবা, ভগবান আমার ডাক শুনেছে" সিস্টারের কোলে একটা তোয়ালের মধ্যে জড়ানো ফুটফুটে বাচ্চা।নাতনিকে দেখে এক অপার প্রশান্তি চোখে মুখে।ভগবানের কাছে একটাই কামনা
-"নাতনিটা যেন সুস্থ থাকে,ওর মায়ের মতো যেন কষ্ট না পায়.."....
(দুই)
আজ থেকে প্রায় ২৬ বছর আগের ঘটনা....
রোজকার মতো সেদিনও স্কুলে যাবে বলে স্টেশনে পৌঁছে দিদিমণি কৃষ্ণা দেখে প্ল্যাটফর্মে একটা জটলা।
কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করে জানতে পারে ট্রেনের সিটের তলায় কেউ একটা বাচ্চা ফেলে রেখে গেছে.. খুব বেশি হলে ২ দিন বয়স, শরীরে ক্ষতর দাগ, তবে বাচ্চাটা বেঁচে আছে।
পুলিশ এসে বাচ্চাটাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। খবরটা শুনে খুব মুষড়ে পড়েছিল কৃষ্ণা....
"মানুষ এত নিষ্ঠুর কেন!!" ভাবতে ভাবতে মন ভারী হয়ে উঠেছিল।
সেদিন কাজে কিছুতেই মন বসছিলনা।কৃষ্ণা ভাবল যে বাড়ি ফেরার পথে একবার বাচ্চাটার খোঁজ নেবে হাসপাতাল থেকে।এইভাবে রোজ খোঁজ নিতে নিতে বাচ্চাটির প্রতি একটা টান অনুভব করে।হাসপাতালে ডাক্তার, সিস্টারদের সেবা যত্নে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।
অবশেষে কৃষ্ণা সিদ্ধান্ত নেয় দত্তক নেবে বাচ্চাটাকে।
নিজের সিদ্ধান্তের কথা বাড়িতে জানায়।কিন্তু ধাক্কা খাওয়া বাকি ছিল।কৃষ্ণার মা, বাবা রাজি হলেও হবু শাশুড়ি মা বলে
-"দেখো মা, কোন জাত, বাপ মা কে, চোর, ডাকাত না খুনীর বাচ্চা, কিছুই তো জানোনা! তাই শুধু শুধু এসব অজাত, কুজাতের বাচ্চাকে ঘরে ঢোকানো বিপদ। তাছাড়া আমাদের বাড়িতে নিত্য সত্যনারায়ণ পুজো হয়, এসব অনাচার আমি কিছুতেই মেনে নেব না।এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত"
দুধের শিশুটা যে সবার আগে মানুষ সেটাই শাশুড়িমার চিন্তাভাবনার ত্রিসীমানাতেও আসেনি।কৃষ্ণার কোনো যুক্তিই তিনি মানতে চাননি..অশোক, কৃষ্ণার হবু স্বামী, সেও বলল -"আমি কোনো অশান্তি চাই না।মায়ের কথাই শেষ কথা।তোমার কথা রাখার জন্য আমি মায়ের অবাধ্য হতে পারব না"....
অতঃপর বিয়েটা ভাঙতেই হল।অবশ্য যার সাথে ঘর বাঁধতে যাচ্ছিল সেই মানুষটাকে তো চেনা গেল!সে কতটা মেরুদন্ডহীন! ঠিক ভুলের বিচারের ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতখানি!
যে বাড়িতে একটা শিশুর অসহায়তার থেকে তার জাতপাত অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই বাড়ির বউ না হওয়াতে তাই কৃষ্ণা খুব একটা কষ্ট পায়নি....
অবশেষে আইনি জটিলতা কাটিয়ে দত্তক নিল মেয়েটাকে।
মেয়ে মৌ এর যখন ৫ বছর বয়স তখন নিলয়কে পাশে পেয়েছিল নিজের জীবনসঙ্গী,বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে......
(তিন)
দেখতে দেখতে সময় কিরকম পার হয়ে যায়.. আজ তার পুচকিটা নিজেই আর একটা পুচকির মা.....
-সমাপ্ত-
Reviewed by Dhuliyan City
on
08:22
Rating:
No comments: