#প্রতিবাদের_উপায়
#সোমা_সিনহা
মেয়েটা যখন জন্মালো,মেয়েটার ঠাকুরদা খুব খুশী,বাবাও খুব খুশী,কিন্তু মেয়েটার মা অবাক হয়ে দেখে ওর ঠাকুরমা যেন খুশী নয়!ঘরের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে শুধুই কেঁদে চলেছে,গুমরে গুমরে কেঁদেই চলেছে।
বৌমা জিজ্ঞাসা করলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুধু|বৌমার মনে অভিমান তৈরি হয়
-"তাহলে কি নাতনি না হয়ে নাতি হলে তুমি খুশী হতে মা ?তোমার থেকে আমার স্বামী শ্বশুর তো অনেক বেশী উদার.."
শাশুড়ি তবু কোনও উত্তর দেয়না|এরা খুব সাধারণ,নিম্নবিত্ত পরিবারের লোক,একদম মাটির কাছাকাছি এদের বাস,সমাজের জৌলুস এদের স্পর্শ করেনা।
হরেন আর ওর ছেলে বিল্ব মাছ ধরে নদীতে সেই মাছ দূর দূরান্তে বিক্রি করে বেড়ায়,কত টাকা রোজগার হয়,বা কত খরচ হয় তার হিসাব বাড়ির বউরা পায়না,তাদের প্রয়োজনের যা কিছু,সেটুকু পেলেই ওরা খুশী।
কিন্তু শাশুড়ির কেন মেয়ে অপছন্দ,সে নিজেও তো মেয়ে,তবে ?
দিন যায় মাস বছর যায়,মেয়ে বড় হয় একটু একটু করে,যে শাশুড়ি নাতনীর জন্মের সময় কেঁদেছিল সেই কিনা এখন নাতনিকে চোখ ছাড়া করতে চায়না,দেখে শুনে বউমা একদিন বলে
-"কিগো মা ?এখন যে বড় নাতনীর প্রতি টান"?
শাশুড়ি ফ্যাকাশে হাসে,মুখে কিছু বলেনা|হরেন বা বিল্ব মেয়েটিকে আদর করতে চাইলে ঠাকুরমা বিরক্ত হয়,বৌমাকে একদিন ডেকে বলল
-"দেখ বৌ,মেয়ে তোর হতে পারে,কিন্তু ওকে আমি আমার মতো করে বড়ো করব"
বৌমা বলে
-"বেশ তো করোনা,আমি তবে বেঁচে যাই"|
ঠাকুরমা নাতনীকে স্কুলে ভর্তি করে,প্রাইভেট টিউশন দেয়।সেখানে যতক্ষণ থাকে চুপ করে গাছতলায় বসে থাকে,ছুটি হলে সঙ্গে করে বাড়ি ফেরে|
বছর কয়েক পর শিউলি যখন মাধ্যমিক দেবে,হরেন এসে সবার সামনে প্রস্তাব দিল
-"অনেক হয়েছে পড়াশোনা,মাধ্যমিকটা হলেই শিউলির বিয়েটা এবার দিয়ে দিই|কি বলো বউমা"?
বিল্ব বাবার কথায় সায় দিয়ে বলে
-"হ্যাঁ হ্যাঁ,পড়া যা শিখেছে অনেক,আমরা তো ইস্কুলের মুখই দেখিনি"
বলেই বাবার দিকে তাকিয়ে বিশ্রীভাবে হাসে বিল্ব|
শিউলির মা শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে শাশুড়ি নির্বিকারভাবে রান্না করছে। হরেন এবার একটু অস্থির হয়,বলে
-"কিগো বিলোর মা,কিছু বলছো না যে ?বিয়েটা দিয়েই দিই নাকি"?
বিল্বর মা এবার ফিরে দাঁড়ায়। তার মুখ দেখে চমকে ওঠে সবাই। মাথার ঘোমটা খসে খুলে গেছে চুলের খোঁপা,ফর্সামুখ রাগে লাল,হাতে সব্জিকাটা বঁটি হাতে তেড়ে এল স্বামী পুত্রের দিকে,হরেন কয়েক পা পিছিয়ে বলে
-"করো কি বউ ?"
বিল্ব ভয়ার্ত গলায় বলে
-"মা বঁটি নামাও ভয় লাগছে তো!"
বিল্বর মা হিসহিসে গলায় বলে
-"শিউলির দিকে তাকালে তোদের দুজনকেই আমার হাতে মরতে হবে বললাম।জেগে থাকলে ক্ষমতায় কুলাবেনা,যখন ঘুমাবি,বাপ ব্যাটাকে কুচিকুচি করে কেটে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলব আমি,তবু ওকে হারাবোনা..."
শিউলির মা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে -"তুমি এখন ওর বিয়ে দেবেনা বললেই তো হয়!সহজ কথার উত্তর এমন করে দিচ্ছ কেন মা"?
শাশুড়ি এবার রক্তচক্ষু দেখিয়ে বউমাকে বলল
-"যা বুঝিসনা,তা নিয়ে কথা বলিসনা।শুধা তোর শশুর,স্বামীকে,কোথায় তোর দুই ননদ ?কেন বিয়ের পর একবারও এলনা,আমার বুকটা ফাঁকা করে দিয়েছে,ওদের বাবা আর ভাই,বিয়ের নামে বিক্রি হয়ে গেছে ওরা জানিস ?
সেই একই ঘটনা আমি আমার নাতনীর সঙ্গে কোনওমতেই হতে দেবনা...তুই জানিস বউ,আমার মেয়েরা হাতবদল হয়ে এখন তিননম্বর বাবুর সংসার করছে...ওরাও এখন বাবা দাদার মতো মেয়ে ধরার কাজে লেগেছে,এরা বিয়ের নামে শিউলিকে ওদের কাছেই নিয়ে যাবে"|
শিউলি কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছিল সেখানে। ঠাকুরমার বঁটিধরা হাতটা মুঠোতে ধরে বলল
-"তুমি চিন্তা করো না ঠাম্মা,আমি বাবাদাদুকে একই ভুল আর করতে দেবো না,পিসিদের পথে আমি আর যাবোনা,আমি পড়াশোনা করছি,সমাজটা আমিও চিনছি,তোমার পাশে আমিও আছি"|
শিউলিকে ওর ঠাকুরমা বুকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে।নাতনীরও চোখ শুকনো থাকেনা।
ঠাকুরমা আর নাতনীর পবিত্র চোখের জলে হরেন আর বিল্বর মনের পাপ যেন একটু একটু করে ধুয়ে যাচ্ছিল।আর তাই বুঝি মাথা নীচু করে হরেন আর বিল্ব ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে গেলো.....
-সমাপ্ত-
Reviewed by Dhuliyan City
on
10:47
Rating:
No comments: