#কুহেলী_কর্মকার
প্রবল বেগে মেঘ গর্জে উঠে হঠাৎ মুশলধারে বৃষ্টি নামলো।বিদ্যুৎ-এর ঝলকানি অনুরাগের কেবিনের কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে তার চশমার স্বচ্ছ কাঁচে গিয়ে পড়ছিল।ঠান্ডা কেবিনটা কেঁপে উঠছিল বারবার মেঘের আওয়াজে।একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার নিজের ল্যাপটপে মন দিল অনুরাগ। এসব কিছুই তাকে আর আকৃষ্ট করে না।দীর্ঘদিন এই ঠান্ডা কেবিনে থাকতে থাকতে অনুরাগের মনটাও কঠিন-ঠান্ডা বরফে পরিনত হয়েছে।আর তার জীবনটা হয়ে উঠেছে অন্তহীন রূক্ষ মরুভূমি, নিষ্প্রান আর নিষ্ঠুর।কবে যে সেখানে বসন্ত আসবে কে জানে..
কলকাতার একটি নামি কোম্পানির এম.ডি. অনুরাগ।তার এক ইশারায় কারুর ভাগ্য তৈরী হতে পারে,আবার বরবাদ্ ও হতে পারে। অফিসে সবাই তাকে জমের মতো ভয় পায়।টাকা আর কাজ ছাড়া সে কিছুই বোঝে না।তার জীবনের এই রূক্ষতা, তাকে আজ পর্যন্ত একা করে রেখেছে। স্ত্রী সোহিনীও বিয়ের চার বছরের মধ্যেই তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গেছে।
আর যাওয়ার সময় বলে গেছিল- "এ রকম প্রাণহীন যন্ত্রের সাথে,আমি থাকতে পারবো না।" সেইদিন থেকে অনুরাগ একা।আর মজার কথা এই যে,এই একাকীত্বটা অনুভব করার মতো সময় ও তার নেই।সবসময় তাকে আরও বড়ো হওয়ার নেশা,আরও সফল হওয়ার নেশা তাড়া করে বেড়ায়।
এটার অবশ্য একটা কারন ও আছে। অনুরাগের জীবনটা কোনো দিনই,আর পাঁচটা সাধারন মানুষের মতো ছিল না।দিল্লির এক বিখ্যাত ব্যবসায়ীর সন্তান হওয়া সত্ত্বেও সারাজীবন তাকে নিজের অস্তিত্বের জন্যে লড়াই করতে হয়েছিল।কারণ তার বাবা মার সমাজ স্বীকৃত বিবাহ হয়নি।সমাজ তার গায়ে অবৈধ সন্তানের ট্যাগ লাগিয়ে দিয়েছিল।তার লেখাপড়া, তার ট্যালেন্ট,তার অস্তিত্ব সবই ঢাকা পড়ে যেত এই ট্যাগের পিছনে।মা মারা যাওয়ার পর হস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করতো সে।বাবা একবারও আসেনি দেখতে, তবে প্রতিমাসে বাবার পাঠানো চেক্ ঠিক টাইমে পৌঁছে যেত। আর বড়ো হয়ে যখন সে বাবার কাছে গেল,তার সমাজ স্বীকৃত ভাইয়ের সমান অধিকার চাইল, সমাজে সম্মান চাইল নিজের জন্যে।তখন তার নিজের বাবা তাকে অস্বীকার করল,ঘার ধাক্কা দিয়ে তাকে বাড়ির বাইরে ফেলে দিল।
সেইদিন রাগে,দু:খে, ঘেন্নায় সে দিল্লি শহর ছেড়ে ছিল।সে চাইলে আইনের পথে গিয়ে নিজের অধিকারের জন্যে লড়তে পারত। কিন্তু সে ঐ বাবার সন্তানের পরিচয়ে বাঁচতে চাইনি।নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব তৈরী করতে চেয়েছিল সে।আজ সে এই কাজে সফল।
তবে এতো কিছুর পরও যখনই সে নিজেকে প্রশ্ন করে-" আমি কি খুশি? উত্তর সবসময়" না" ই আসে।তার প্রতিটা দিন কাটে মিটিং,কনফারেন্স, বিসনেস্ ডিল নিয়ে।আর রাত কাটে সিগারেটের ধোঁয়া আর মদের নেশায়।
এমনই চলতো দিনগুলো যদি সেই ঘটনাটা না ঘটত।তাদের কোম্পানির সামান্য একটা কর্মচারী দীনেশ।যে চা,কফি,ফাইল ডেলিভারী ইত্যাদি কাজ করত।সে অনুরাগের কেবিনে কফি দিতে এসেছিল,হঠাৎ তার হাত ফসকে কফিটা কিছু ইমপরটৈন্ট ফাইল আর ল্যাপটপের ওপর পড়ে যায়।অনুরাগ রাগে জ্ঞ্যানশূন্য হয়ে যায়। তখনই তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেয়। দীনেশ তার পা ধরে কাকুতি-মিনতি করে - "এই কাজটা চলে গেলে মরে যাব স্যার।আমার ছোট্ট দুটো বাচ্চা আছে।"
"তো মরে যাও।আমার অফিস থেকে এখনই না গেলে, ঘার ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব। এমন ইরেসপনসিবেল মানুষের কোনো জায়গা নেই এখানে।"
আর সেই দিনই দূর্ভাগ্যবসত একটা পথ দূর্ঘটনায়,লড়ির নিচে চাপা পড়ে দীনেশ মারা যায়।অনুরাগ খবরটা তিনদিন পর মুম্বাই থেকে ফিরে শুনেছিল। খবরটা শোনার পর থেকে অনুরাগ ছ্ট্ফট্ করতে থাকে।একটা অপরাধ বোধ তাকে গ্ৰাস করছিল।পরের দিনই সে দীনেশের বাড়ি পৌঁছায়।
"কি করে ওদের সামনে দাড়াব?কি করে সব বলবো?ওরা কি ক্ষমা করতে পারবে আমাকে..?" এইসব ভাবতে ভাবতে ভেতরে ঢুকে সে জানতে পারল,দীনেশের পরিবার বলতে আছে একটা সাত বছরের ছেলে আর চার বছরের মেয়ে।তার স্ত্রী মারা গেছে।আত্মীয় স্বজন কেউ নেই যে এই বাচ্চা দুটোর দায়িত্ব নেবে।তাই পাড়ার লোকে মিলে ঠিক করেছে ওদের অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেবে। "আমার জন্যে ওদের এই অবস্থা।কি করে এতো নিষ্ঠুর হয়ে গেলাম আমি। আজ আমার জন্মদাতা ব্যক্তির সাথে কি ই বা তফাৎ রইল আমার।"
সেদিন কোনো ভাবনা চিন্তা না করেই অনুরাগ সেই বাচ্চা দুটোকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে।তাদের সকল দায়িত্ব নেয়।আর এই দুটো বাচ্চাই পাল্টে দেয় তার জীবন।আস্তে আস্তে এই রূক্ষ মানুষটা অমিত আর মিলির বাবাই হয়ে ওঠে।অনুরাগ এখন আর সারাদিন কাজে ডুবে থাকে না।তার বাড়ি ফেরার কতো তাড়া, ছেলে, মেয়ে যে অপেক্ষা করে থাকে তার জন্যে।ছুটি পেলেই অনুরাগ অমিত,মিলিকে নিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে চলে যায়।এখন তার সমস্ত মন জুড়ে অমিত আর মিলির ভাবনা। এক আশ্চর্য জাদুতে যেন অনুরাগের জীবনের বরফের মরুভূমিতে আজ বসন্ত নেমেছে।সমস্ত বরফ গলে জল হয়ে গেছে।না কোনো প্রেয়সীর উষ্ণ প্রেমের ছোঁয়ায় নয়,এই বরফ গলেছে ছোট্ট দুটো ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুর নিস্বার্থ ভালোবাসার ছোঁয়ায়।
যে অস্তিত্বের খোঁজ তাকে তাড়া করে বেড়াত।সেই অস্তিত্বের খোঁজ সে পেয়েছে,ওদের বাবা হওয়ার আনন্দের মধ্যে দিয়ে।আজ সে প্রকৃতই তার জন্মদাতার থেকে অনেক বড়ো,অনেক উঁচু হয়ে উঠেছে। এখন,যখনই সে নিজেকে প্রশ্ন করে- "আমি কি খুশি?"
উত্তর আসে- "হ্যাঁ আমি খুশি ।"
(সমাপ্ত)
No comments: